এক বাটি মাছের ঝোল
এক বাটি মাছের ঝোল
~ পলাশ বাউরি
মাছের ঝোল! এই শুনে ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। একজন তো হাসতে হাসতে কেঁদেই ফেলল। একজন জিজ্ঞেস করলো ওই মাছের ঝোলে কি মাছও থাকে? রাজেশ বলল, না শুধুই ঝোল। একজন হেসে বলল কাতলার ঝোল নাকি ইলিশের ঝোল, এভাবে সবাই নানান অদ্ভুত প্রশ্ন করে তাকে বিরক্ত করতে শুরু করল, রাজেশের চোখ ছলছল করে উঠল কিন্তু কাউকেই কিছু বলল না শুধু নিজের মনের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সবার কত ভালো ভালো শক্তি আছে, কেউ উড়তে পারে, কেউ অদৃশ্য হতে পারে, আর আমি, ইচ্ছে মতন কোনো জড় জিনিসকে এক বাটি মাছের ঝোলে পরিণত করতে পারি! ধুস.. কি বাজে শক্তি।
প্রতিটি মানুষের ১২ বছর বয়স হলেই কিছু না কিছু অতি প্রাকৃতিক শক্তি তার মধ্যে প্রকট হয়। রাজেশের পাড়া প্রতিবেশীর সব সুন্দর সুন্দর শক্তি, এই যেমন পাশের বাড়ির সঞ্জয় উড়তে পারে, আবার সঞ্জয়ের ভাই নিজের ইচ্ছে মতো আকারে ছোট বড় হতে পারে। কিন্তু তারই কপালে জুটল এমন অদ্ভুত শক্তি।
প্রতিদিন বিদ্রুপের শিকার হতে হতেই সে স্কুলের পর্ব শেষ করল। তবে সে আর কলেজের দিকে পা বাড়াল না, ঘরের আর্থিক পরিস্থিতির কথা ভেবে, রাস্তার মোড়ের একটা খাবার হোটেলে কাজ নিল। সেখানে তার শুধু একটাই কাজ মালিকের এনে দেওয়া নুড়ি পাথরগুলোকে মাছের ঝোলে পরিণত করা। সেই ঝোলে ভাজা মাছ ছেড়ে দিয়ে একটু গরম করলেই ব্যাস। মাইনেও খুব একটা খারাপ না, মোটামুটি দিন চলে যায়। তবে তার এই শক্তির জন্য তার মাছের প্রতি এমন বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে যে সে মাছ খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে।
মাস খানেক পর, চারদিকে হঠাৎ ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে গেল, বিজ্ঞানীরা নাকি বলেছে একটা বড় উল্কা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে আর অনেক চেষ্টা করেও তাকে নাকি আটকানো যাচ্ছে না। বিশেষ শক্তিযুক্ত লোকদের মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু তারাও বিফল হয়ে ফিরে এসেছে। এ উল্কা পৃথিবীতে আছড়ে পড়লে ভারতের বেশ কয়েকটা শহর নাকি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তাই সরকার নিরুপায় হয়ে অনেক শহর গ্রাম খালি করে বাসিন্দাদের অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে। রাজেশের হোটেলে কয়েকজন এই নিয়েই গল্প করছিল, গোটা ব্যাপারটা রাজেশ তাদের কাছেই শুনলো, তবে প্রশাসন থেকে মাইকে করে জানিয়ে গিয়েছে যে তাদের শহর ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার নাকি কোনো সম্ভাবনা নেই। এটা শুনে রাজেশ একটু স্বস্তি পেলেও ওই শহরগুলো থেকে এখনও অনেক লোক বেরিয়ে আসতে পারেনি শুনে তার হৃদয় কেঁদে উঠল। হঠাৎই হোটেলের মালিক রাজেশকে ধমক দিয়ে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প শুনলে হবে, যা রান্নাঘরে রাখা নুড়িপাথরগুলোকে মাছের ঝোল করে নিয়ে আয়, অনেক খদ্দের অপেক্ষা করে আছে। রাজেশের মাথার বাতি জ্বলে উঠল।
চার দিন পর খবরের কাগজে হেডলাইন বার হল, দুদিন পরেই নাকি উল্কা আছড়ে পড়বে পৃথিবীতে। রাজেশ প্রস্তুত হতে লাগল। ব্যাগে কয়েক বোতল জল, কিছু বিস্কুটের প্যাকেট, আর একটা বাটি নিয়ে সাইকেলে বেরিয়ে পড়ল, বাড়িতে বলেছে কদিনের জন্য অন্য শহরে এক বন্ধুর বাড়িতে ঘুরতে যাচ্ছে। স্টেশনে গিয়ে খবর নিল, জানল ওই রুটে আজ-কাল কোনো ট্রেন নেই। রাজেশ মনে মনে প্রস্তুতই ছিল, সাইকেলেই যাবে ঠিক করল। এখান থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে ওই শহর কিন্তু কিছু করার নেই তাকে সাইকেলেই যেতে হবে। রাজেশ পুরো একদিন লাগাতার সাইকেল করে ঠিক যেখানে উল্কাটা আঘাত হানবে সেখানে পৌঁছাল। রাস্তায় দেখল শয়ে শয়ে লোক অন্য জায়গায় যাচ্ছে, কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ বাইকে, কেউ আবার গরুর গাড়িতে।
সে এখানে এসে দেখল চারদিকে খাঁ খাঁ করছে, একটা প্রাণীরও দেখা নেই, শুধু ফাঁকা বাড়িগুলো পড়ে রয়েছে। পরিবেশ একেবারে চুপ, যেন সেই ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। আকাশে একটা বড় কালো দাগ দেখা যাচ্ছে, এটাই সেই উল্কা। আর মাত্র কয়েক মিনিট! রাজেশ একটা পরিষ্কার জায়গা দেখে বসে পড়ল, তার হাতে শুধু একটা ছোট্ট বাটি আর মুখে গর্বের হাসি। যে মুহূর্তেই ওই উল্কা পৃথিবীতে পড়তে শুরু করবে সেই মুহূর্তেই রাজেশ তাকে এক বাটি মাছের ঝোলে পরিণত করে দেবে। সেদিন যেটা বাজে শক্তি ভেবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলাম আজ সুযোগ এসেছে। কিছক্ষনের মধ্যেই উল্কা বাটি বন্দি ঝোলে পরিণত হবে। এক বাটি মাছের ঝোলই আজ ওই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাবে।
প্রথম প্রকাশ: শারদীয়া সঞ্চিতা, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
রচনাকাল: ২০২৩